বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাথরঘাটায় জরায়ু টিউমারের অপারেশন করতে গিয়ে লাশ হলেন রেনু বেগম ! ভুল চিকিৎসা ও প্রলোভন দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ।

আড়ালের খবর
আড়ালের খবর ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৪ এএম
পাথরঘাটায় জরায়ু টিউমারের অপারেশন করতে গিয়ে লাশ হলেন রেনু বেগম !   ভুল চিকিৎসা ও প্রলোভন দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ। পড়েছেন ২৬ জন


বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় জরায়ু টিউমারের অপারেশন করাতে গিয়ে চিকিৎসার অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন রেনু বেগম (৪৫) নামের এক গৃহবধূ। চিকিৎসকের আশ্বাসে ক্লিনিকে ভর্তি হয়ে শেষ পর্যন্ত লাশ হয়ে ফিরতে হলো তাকে। 

ঘটনাটি ঘটেছে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়ায় অবস্থিত ‘কাকচিড়া সার্জিকেয়ার ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে’।

নিহত রেনু বেগম পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের উত্তর হলতা গ্রামের বাসিন্দা দুলাল মিয়ার স্ত্রী।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ১০ অক্টোবর রেনু বেগম চিকিৎসার জন্য বরগুনার বামনা উপজেলার ডৌয়াতলা বাজারে অবস্থিত ডা. আমির হামজার চেম্বারে যান। প্রাথমিক পরামর্শ শেষে ডা. আমির হামজা তাকে পাথরঘাটার কাকচিড়া সার্জিকেয়ার ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন এবং নিজেই সফলভাবে অপারেশন করার বিষয়ে পরিবারকে শতভাগ আশ্বাস দেন।

ডাক্তারের কথামতো গত ১১ অক্টোবর রেনু বেগম কাকচিড়া সার্জিকেয়ার ক্লিনিকে ভর্তি হন। ভর্তির পর প্রাথমিক পরীক্ষায় উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ায় দুই দিন পর তার জরায়ু টিউমারের অপারেশন করা হয়।

অপারেশনের পর ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে অস্ত্রোপচার ‘সফল’ হয়েছে। কিন্তু গত ১৯ অক্টোবর রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। এ সময় তড়িঘড়ি করে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ রেনু বেগমকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে রেফার করে। পরবর্তীতে ২০ অক্টোবর শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রেনু বেগম।

রেনু বেগমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এবং স্বজনরা এর প্রতিবাদ জানিয়ে চাপ সৃষ্টি করলে ঘটনা ধামাচাপা দিতে তৎপর হয়ে ওঠে ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি আপস-মীমাংসা করার শর্তে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেয় তারা। এমনকি প্রাথমিক পর্যায়ে দাফন-কাফন ও মিলাদ মাহফিলের খরচের কথা বলে কিছু টাকা স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

একই সাথে স্বজনদের ভয় দেখিয়ে বলা হয়, এ বিষয়ে কোনো মামলা বা বাড়াবাড়ি করলে দাফন করা লাশ কবর থেকে তুলে ময়নাতদন্তের (পোস্টমর্টেম) জন্য পাঠানো হবে। এই আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে স্বজনরা দাফন সম্পন্ন করলেও পরবর্তীতে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ না দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নেয় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ—এমনটাই দাবি ভুক্তভোগী পরিবারের।

পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও দায় এড়ানোর চেষ্টা: ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে সরজমিনে অনুসন্ধান চালালে কাকচিড়া সার্জিকেয়ার ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ ঘটনা অস্বীকার করার চেষ্টা করে। তারা দাবি করেন, "রেনু বেগম অপারেশনের পর সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন এবং তাকে ছাড়পত্র (রিলিজ) দেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি শের-ই-বাংলা মেডিকেলে মারা যান, যা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না।"

তবে গণমাধ্যমের হাতে ওই ক্লিনিক কর্তৃক রেনু বেগমকে সরাসরি শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের (রেফার) দাপ্তরিক প্রমাণ সংরক্ষিত রয়েছে।

অন্যদিকে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক ডা. আমির হামজার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দায় ঠেলে দেন ক্লিনিকের ওপর। তিনি জানান, "আমি সফলভাবে অপারেশন সম্পন্ন করেছি। অপারেশনের পরবর্তী চিকিৎসার মূল দায়িত্ব ছিল কাকচিড়া সার্জিকেয়ার ক্লিনিকের আবাসিক সার্জনের। নিয়মিত পরিচর্যা ও চিকিৎসায় তাদের কোনো ভুল ছিল কিনা তা আমার জানা নেই।" তবে ওই ক্লিনিকের আবাসিক সার্জন মাঝে মাঝে তার কাছ থেকে মুঠোফোনে পরামর্শ নিয়েছেন বলেও তিনি স্বীকার করেন।

জরায়ুর মতো সংবেদনশীল ও জটিল অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে রোগীর পূর্ণাঙ্গ শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও উপযুক্ত পরিবেশ ছাড়া কীভাবে এমন ঝুঁকি নেওয়া হলো—তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সচেতন মহলে। উচ্চ রক্তচাপ থাকা অবস্থায় পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া অপারেশন করা এবং পরবর্তীতে সঠিক পরিচর্যার অভাবই এই মৃত্যুর কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে এলাকায় চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী পরিবার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষী চিকিৎসক ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের কঠোর বিচার দাবি করেছে।

বরগুনা সিভিল সার্জন ডাঃ মোহাম্মদ আবুল ফাওাহ জানান,বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক। তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে  ব্যববস্থা গ্রহণ করা হবে।

পাথরঘাটায় জরায়ু টিউমারের অপারেশন করতে গিয়ে লাশ হলেন রেনু বেগম ! ভুল চিকিৎসা ও প্রলোভন দিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ।
0:00 / 0:00
1x